বিএ (B.A.) ২য় সেমিস্টারের বাংলা (MIL) ‘BNGMAE2: বাংলা ভাষা প্রসঙ্গ ও অনুবাদ’ প্রশ্নপত্রের উত্তর ২০২৬
![]() |
| বিএ (B.A.) ২য় সেমিস্টারের বাংলা (MIL) ‘BNGMAE2 বাংলা ভাষা প্রসঙ্গ ও অনুবাদ’ প্রশ্নপত্রের উত্তর ২০২৬ |
বিভাগ - ক
(যে-কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর)
১। ভাষা পরিকল্পনার প্রধান ক’টি স্তর এবং কী কী?
উত্তর: ভাষা পরিকল্পনার প্রধান স্তর হলো ৩টি। যথা:
১. মর্যাদা পরিকল্পনা (Status Planning): সমাজে ভাষার সরকারি, শিক্ষাগত ও আনুষ্ঠানিক মর্যাদা নির্ধারণ।
২. রূপ পরিকল্পনা বা কাঠামো পরিকল্পনা (Corpus Planning): ভাষার বর্ণমালা, বানান, ব্যাকরণ ও পরিভাষা সংস্কার ও উন্নয়ন।
৩. অধিগ্রহণ পরিকল্পনা (Acquisition Planning): সাধারণ
মানুষের মধ্যে ভাষা শিক্ষাদান ও ব্যবহারের প্রসার ঘটানো।
২। লিঙ্গভেদে সমাজভাষায় যে পরিবর্তন ঘটে, তার দু’টি দৃষ্টান্ত দাও।
উত্তর:
লিঙ্গভেদে সমাজভাষার পরিবর্তনের দুটি
উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত:
১. শব্দ চয়ন ও কোমলতা:
নারীদের ভাষায় সাধারণ সংবেদনশীল, কোমল ও সংশয়সূচক শব্দের (যেমন: ‘বোধহয়’, ‘সম্ভবত’,
‘ভারী সুন্দর’) ব্যবহার বেশি দেখা যায়, যা পুরুষদের ভাষায় তুলনামূলকভাবে কম।
২. সম্বোধন রীতি: সমাজে
পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত সম্মানসূচক বা পদবিভিত্তিক সম্বোধন বেশি ব্যবহৃত হলেও
নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় পারিবারিক বা নাম ধরে ডাকবার প্রবণতা সমাজভাষায় লক্ষ
করা যায়।
৩। বাক্যে অর্থানুসারে ‘কি’ এবং ‘কী’ ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলি উল্লেখ
করো।
উত্তর:
‘কি’ (হ্রস্বই-কার): যে প্রশ্নের উত্তর
কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে দেওয়া সম্ভব, সে ক্ষেত্রে ‘কি’ ব্যবহৃত হয়।
- উদাহরণ: তুমি কি ভাত খেয়েছ?
‘কী’ (দীর্ঘই-কার): যে প্রশ্নের উত্তর
বিস্তারিতভাবে দিতে হয় এবং যা নির্দেশক/প্রশ্নবাচক সর্বনাম হিসেবে কাজ করে, সে
ক্ষেত্রে ‘কী’ ব্যবহৃত হয়।
- উদাহরণ: তুমি আজ কী খাবে?
৪। শুদ্ধ বানান লেখো: মনকষ্ট/মনঃকষ্ট, প্রতিযোগীতা/প্রতিযোগিতা,
সমীচীন/সমিচিন, বুদ্ধিজীবি/বুদ্ধিজীবী
উত্তর:
মনকষ্ট / মনঃকষ্ট → মনঃকষ্ট
প্রতিযোগীতা / প্রতিযোগিতা →প্রতিযোগিতা
সমীচীন / সমিচিন →সমীচীন
বুদ্ধিজীবি / বুদ্ধিজীবী →বুদ্ধিজীবী
৫। বাংলা শব্দভাণ্ডারে গৃহীত দু’টি
ফারসি শব্দের উদাহরণ দাও।
উত্তর:
বাংলা শব্দভাণ্ডারে গৃহীত দুটি ফারসি শব্দ হলো:
১. কাগজ
২. চশমা (অন্যান্য:
নালিশ, দোকান, খাজন ইত্যাদি)
৬। উদাহরণসহ তদ্ভব শব্দের সংজ্ঞা দাও।
উত্তর:
সংজ্ঞা: যেসব শব্দ
প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা (সংস্কৃত) থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রাকৃত ও অপভ্রংশের মধ্য
দিয়ে দীর্ঘ পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বাংলা ভাষাভাষীর উচ্চারণে রূপান্তরিত ও গৃহীত
হয়েছে, সেগুলিকে তদ্ভব শব্দ বলে।
- উদাহরণ:
সংস্কৃত → প্রাকৃত → বাংলা
হস্ত → হত্থ → হাত
কার্য → কজ্জ → কাজ
৭। একজন আদর্শ অনুবাদকের দু’টি গুণাবলী লেখো।
উত্তর:
১. দ্বিভাষিক দক্ষতা (Bilingual
Competence): মূল ভাষা (Source Language) এবং লক্ষ্য ভাষা (Target
Language)—উভয় ভাষাতেই সমান অধিকার ও গভীর শব্দভাণ্ডারের দখল থাকা আবশ্যক।
২. সংস্কৃতিক বোধ ও নিরপেক্ষতা:
অনুবাদের সময় মূল রচনার মূল ভাব ও সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে নিরপেক্ষভাবে ভাব
ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা থাকতে হবে।
৮। ইংরেজিতে অনুবাদ করো : আমরা ভারতবাসী হিসেবে গর্বিত।
উত্তর: English Translation: “We
are proud to be Indians.” (বা “We are proud as Indians.”)
বিভাগ - খ
(যে-কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর)
৯। ভাষা পরিকল্পনার স্তরগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
উত্তর: ভাষা পরিকল্পনা (Language
Planning) হলো একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভাষা ব্যবহারে সচেতন ও প্রাতিষ্ঠানিক
হস্তক্ষেপ। সমাজভাষাবিজ্ঞানী হেইন্স (Einar Haugen) ও অন্যান্য ভাষাবিজ্ঞানীদের
মতে ভাষা পরিকল্পনার তিনটি প্রধান স্তর রয়েছে:
১. মর্যাদা পরিকল্পনা (Status
Planning):
এই স্তরে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক স্তরে ভাষার
ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়। একটি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা, সরকারি ভাষা, শিক্ষার মাধ্যম
নাকি সংখ্যালঘু ভাষা হিসেবে গণ্য করা হবে—তার আইনি ও সামাজিক নীতি এখানে তৈরি হয়।
২. রূপ/কাঠামো পরিকল্পনা (Corpus
Planning):
ভাষার অভ্যন্তরীণ গঠন ও বিকাশ সাধন এই স্তরের
কাজ। এর মধ্যে পড়ে:
বর্ণমালা সংস্কার: লিপির সরলীকরণ ও
প্রমিতকরণ।
বানান প্রমিতকরণ: একাডেমি বা বোর্ড
কর্তৃক নির্দিষ্ট বানানবিধি প্রস্তুত।
পরিভাষা নির্মাণ: আধুনিক বিজ্ঞান,
প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের উপযোগী নতুন শব্দ তৈরি।
৩. অধিগ্রহণ পরিকল্পনা (Acquisition
Planning):
পরিকল্পিত ভাষানীতি ও ভাষার রূপকে সাধারণ
মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং শিক্ষাব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে তা শেখানো ও
ব্যবহারের প্রসারের দায়িত্ব এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত।
১০। তৎসম এবং অর্ধতৎসম শব্দের বানান বিধিগুলি লেখো।
উত্তর:
বাংলা বানানের প্রমিতকরণে তৎসম (সংস্কৃত) ও
অর্ধতৎসম শব্দের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসৃত হয়:
তৎসম শব্দের বানান বিধি:
১. অপরিবর্তনীয়তা: বাংলা
ভাষার ব্যবহৃত তৎসম শব্দের বানান অবিকল সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম (যেমন:
পৈণিনি/পাণিনীয় নিয়ম) অনুসারেই লিখতে হবে। এতে কোনো স্বরচিহ্ন বা রূপ পরিবর্তন
করা যাবে না (যেমন: ধর্ম, সূর্য, পাত্র, কন্যা)।
২. বিকল্প ই/ঈ বা উ/ঊ-কার:
যেসব তৎসম শব্দে ই/ঈ বা উ/ঊ উভয় বানানই ব্যাকরণসম্মত, প্রমিত বাংলা বানানে সেখানে
হ্রস্বই (ি) বা হ্রস্বউ (ু) কার ব্যবহারের
পক্ষপাতী (যেমন: পদবী → পদবি)।
৩. রেফ-এর পর দ্বিত্ব নয়:
রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হবে না (যেমন: ধর্ম্ম → ধর্ম, কার্য্য → কার্য, সূর্য্য → সূর্য)।
অর্ধতৎসম শব্দের বানান বিধি:
১. উচ্চারণানুযায়ী লিখন:
তৎসম শব্দসমূহ সাধারণ মানুষের মুখে বিকৃত বা রূপান্তরিত হয়ে অর্ধতৎসম রূপ পায়।
এদের বানান সংস্কৃত নিয়ম নয়, বরং বাংলা উচ্চারণের নিয়ম অনুসারেই লেখা হয় (যেমন:
শ্রাদ্ধ → ছেরাদ্দ, প্রনাম → পেন্নাম, জ্যোৎস্না → জোছনা)।
২. হ্রস্ব স্বরচিহ্ন ব্যবহার:
অর্ধতৎসম শব্দে সাধারণত দীর্ঘ স্বরবর্ণের জায়গায় হ্রস্ব রূপ (হ্রস্ব-ই বা
হ্রস্ব-উ) ব্যবহৃত হয়।
১১। টীকা লেখো: রেজিস্টার, ভাষামৃত্যু
উত্তর:
রেজিস্টার (Register):
সমাজভাষাবিজ্ঞানে ‘রেজিস্টার’ বলতে বোঝায় সমাজ,
পরিস্থিতি, পেশা বা বিষয়ভিত্তিক ভাষার বিশেষ রূপরীতি। একই ব্যক্তি তার পরিবার,
আদালত, বন্ধুর আড্ডা বা বিজ্ঞানাগারে ভিন্ন ভিন্ন শৈলীতে কথা বলেন।
বৈশিষ্ট্য:
১. এটি কোনো ভৌগোলিক উপভাষা নয়, বরং সামাজিক ও পেশাগত ভূমিকা
নির্ভর (যেমন: চিকিৎসকদের ভাষা, আইনজীবীদের আইনি পরিভাষা, খেলোয়াড়দের ব্যবহৃত
শব্দ)।
২. রেজিস্টার আনুষ্ঠানিক (Formal) বা অনানুষ্ঠানিক (Informal) হতে
পারে। এটি সমাজের বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগকে স্পষ্ট ও গতিশীল করে।
ভাষামৃত্যু (Language Death):
যখন কোনো ভাষা ব্যবহারকারী শেষ প্রাকৃতির বক্তা
(Native Speaker) মৃত্যুবরণ করেন এবং সেই ভাষায় আর কেউ কথা বলে না, তখন সেই ভাষার
বিলুপ্তি ঘটে—একে ভাষামৃত্যু বলা হয়।
কারণ ও প্রক্রিয়া:
১. ভাষিক স্থানান্তর (Language Shift):
শক্তিশালী বা আধিপত্যকারী অন্য কোনো ভাষার প্রভাবে ছোট বা বিপন্ন ভাষার বক্তারা
ধীরে ধীরে নিজেদের ভাষা ত্যাগ করে নতুন ভাষা গ্রহণ করে।
২. সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ: সরকারি
স্বীকৃতি না থাকা, বিশ্বায়ন ও শিক্ষার মাধ্যম থেকে বাদ পড়ার ফলে নতুন প্রজন্ম নিজ
মাতৃভাষা শেখে না।
- উদাহরণ: ভারতে বো (Bo) ভাষার শেষ
বক্তার মৃত্যুর সাথে সাথে ভাষাটির মৃত্যু ঘটে।
১২। আক্ষরিক অনুবাদ ও ভাবানুবাদ - অনুবাদের ক্ষেত্রে কোন্ পদ্ধতিটি
সাহিত্যে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং কেন?
উত্তর:
আক্ষরিক অনুবাদ (Literal Translation): মূল ভাষার প্রতিটি শব্দের প্রতিশব্দ বসিয়ে ব্যাকরণগত রূপ ধরে রেখে
যে অনুবাদ করা হয়।
ভাবানুবাদ (Free/Faithful Translation): মূল ভাষার শব্দের অন্ধ অনুকরণ না করে মূল রচনার অন্তর্দৃষ্টি,
আবেগ ও মূল বক্তব্যকে লক্ষ্য ভাষায় নিজস্ব ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা।
সাহিত্যের ক্ষেত্রে ভাবানুবাদের গ্রহণযোগ্যতা:
সাহিত্য অনুবাদের ক্ষেত্রে ‘ভাবানুবাদ’ পদ্ধতিটিই সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য।
কারণসমূহ:
১. রস ও আবেগের প্রকাশ:
সাহিত্য কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়, এটি অনুভূতি ও রসের সৃষ্টি। আক্ষরিক অনুবাদে
মূল রচনার প্রাণ ও নান্দনিকতা হারিয়ে যায়, কিন্তু ভাবানুবাদ সেই রস সংরক্ষণ করে।
২. সংস্কৃতিক পার্থক্য ও
প্রবাদ-প্রবচন: এক ভাষার বাকধারা বা প্রবাদের আক্ষরিক অনুবাদ অন্য
ভাষায় অর্থহীন হতে পারে। যেমন— English: “It is raining cats and dogs”—এর
আক্ষরিক অনুবাদ হবে “বিড়াল ও কুকুর বৃষ্টি হচ্ছে”, যা হাস্যকর। কিন্তু ভাবানুবাদ
হবে— “মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে”।
৩. সাবলীলতা ও প্রাঞ্জলতা:
সাহিত্য পাঠককে আনন্দ দেয়। আক্ষরিক অনুবাদ আড়ষ্ট ও কৃত্রিম শোনায়, পক্ষান্তরে
ভাবানুবাদ পাঠকে মূল বা মৌলিক রচনার মতো আনন্দ দান করে।
বিভাগ - গ
(যে-কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর)
১৩। ধর্ম, পেশা ও লিঙ্গভেদে সমাজভাষার যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা
উদাহরণসহ আলোচনা করো।
উত্তর:
সমাজভাষাবিজ্ঞান (Sociolinguistics)-এর প্রধান
কাজ হলো সমাজের নানা উপাদানের সাথে ভাষার সম্পর্ক ও বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করা। একই
ভৌগোলিক অঞ্চলে বাস করা সত্ত্বেও ধর্ম, পেশা এবং লিঙ্গভেদে মানুষের ভাষ ব্যবহারের
রীতিতে স্পষ্ট বৈচিত্র্য ধরা পড়ে।
১. ধর্মভেদে সমাজভাষার বৈচিত্র্য:
ধর্মীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ধর্মীয় গ্রন্থ বা
আচার-অনুষ্ঠানের প্রভাবে একই ভাষার মানুষের মধ্যে শব্দচয়নে পার্থক্য দেখা যায়।
বাংলা ভাষায় হিন্দু-মুসলিম বৈচিত্র্য:
জল (হিন্দু সম্প্রদায়) — পানি (মুসলিম সম্প্রদায়)
নিমন্ত্রণ/আমন্ত্রণ (হিন্দু) — দাওয়াত (মুসলিম)
পিসি/মাসি (হিন্দু) — ফুফু/খালা (মুসলিম)
বৌদি (হিন্দু) — ভাবি (মুসলিম)
২. পেশাভেদে সমাজভাষার বৈচিত্র্য (Professional
Jargon/Register):
মানুষের জীবিকা ও কর্মক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে
এক বিশেষ ধরণের শব্দভাণ্ডার বা ভাষারীতি গড়ে ওঠে, যাকে সমাজভাষাবিজ্ঞানে ‘রেজিস্টার’
বা ‘পেশাগত জাঁর্গন’ বলে।
চিকিৎসক/ডাক্তারদের ভাষা: ‘প্যাশেন্ট হিস্ট্রি’,
‘বিপি ডাউন’, ‘ওপিডি’ ইত্যাদি শব্দ সাধারণ কথোপকথনেও প্রাধান্য পায়।
আইনজীবীদের ভাষা: ‘দফা’, ‘আসামী’, ‘শুনানি’,
‘বা His Honour’ জাতীয় বিশেষ পরিভাষার ব্যবহার।
মৎস্যজীবী বা কৃষকদের ভাষা: আবহাওয়া,
নদী বা শস্য সম্পর্কিত বিশেষ কিছু আঞ্চলিক ও পেশাগত শব্দের ব্যবহার যা সাধারণ
মানুষের কাছে অপরিচিত।
৩. লিঙ্গভেদে সমাজভাষার বৈচিত্র্য (Genderlect):
পুরুষ ও নারীর সামাজিক অবস্থান, মনস্তত্ত্ব ও বেড়ে ওঠার পার্থক্যের কারণেও ভাষিক বৈচিত্র্য তৈরি হয়।
কোমলতা ও আবেগ: নারীরা কথোপকথনে
তুলনামূলকভাবে বেশি নমনীয়তা, আবেগ ও ইতিবাচক বিশেষণ ব্যবহার করেন (যেমন: ‘ভারী
সুন্দর’, ‘কী দারুণ!’, ‘হয়তো/বোধহয়’)।
সরাসরি ও কর্তৃত্বমূলক ভঙ্গি: পুরুষদের
কথা বলারীতি সাধারণত বেশি সরাসরি, কর্তৃত্বমূলক বা তথ্যপ্রধান হয়ে থাকে।
শব্দ প্রমিতকরণ: সমীক্ষায় দেখা গেছে,
সামাজিক স্বীকৃতির জন্য নারীরা অসচেতনভাবেই অপেক্ষাকৃত প্রমিত বা শুদ্ধ উচ্চারণ
ব্যবহারের প্রতি অনুরাগী হন, অন্যদিকে পুরুষরা আঞ্চলিক বা ক্যাজুয়াল রূপ বেশি
ব্যবহার করেন।
১৪। বাংলা বানানের নিয়ম নির্ধারণে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির ভূমিকা
আলোচনা করো।
উত্তর:
বাংলা বানানের বিশৃঙ্খলা ও অসামঞ্জস্য দূর করে
সর্বজনগ্রাহ্য একমুখী নিয়ম প্রবর্তনের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির
(প্রতিষ্ঠা: ১৯৮৬) ভূমিকা অত্যন্ত ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী। রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে
গঠিত ১৯৩৬ সালের ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়’-এর প্রমিত বানানরীতির ধারাবাহিকতাকে
আধুনিক যুগের উপযোগী করে আকাদেমি প্রমিত বানানের নতুন নির্দেশিকা জারি করে।
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির প্রধান ভূমিকা ও
নিয়মসমূহ:
১. তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের প্রমিতকরণ:
তৎসম শব্দে সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম মানা হলেও যেসব শব্দে ‘ই’ ও ‘ঈ’
বা ‘উ’ ও ‘ঊ’ উভয় রূপ সিদ্ধ, সে ক্ষেত্রে আকাদেমি কেবল হ্রস্ব
স্বরচিহ্ন (ই/উ) ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে। যেমন: পদবী → পদবি, লঘূ → লঘু।
রেফ (র্)-এর পর দ্বিত্ব রোধ: রেফের পর
ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব রূপ বাতিল করা হয়েছে (যেমন: ধর্ম্ম → ধর্ম, কার্য্য → কার্য, সুৰ্য্য → সূর্য)।
২. অতৎসম (তদ্ভব, দেশি, বিদেশি) শব্দের নিয়ম:
অতৎসম শব্দের ক্ষেত্রে দীর্ঘ স্বরচিহ্ন (ঈ, ঊ)
সম্পূর্ণভাবে বর্জন করে হ্রস্ব-ই এবং হ্রস্ব-উ ব্যবহারের স্পষ্ট
নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন: পাখী → পাখি, শাড়ী → শাড়ি, পুজো → পূজা/পুজো।
‘ন’ ও ‘ণ’-এর ব্যবহার: অতৎসম শব্দে কেবল ‘ন’
ব্যবহৃত হবে, ‘ণ’ নয়। যেমন: রানি, সোনা, কান।
‘স’ ও ‘শ’-এর ব্যবহার: ইংরেজি বা বিদেশি
শব্দে যেখানে ‘S’ উচ্চারিত হয় সেখানে ‘স’ (যেমন: বাস, পাসপোর্ট, স্টেশন)
এবং ‘Sh/Ch’ এর ক্ষেত্রে ‘শ’ (যেমন: শো, শার্ট) ব্যবহারের
নিয়ম প্রবর্তন করা হয়েছে।
৩. অনুস্বার (ং}) ও ‘ঙ’-এর বন্টন:
শব্দের শেষে স্বরবর্ণ না থাকলে অনুস্বার (\dot{ং}) এবং স্বরবর্ণ যুক্ত হলে ‘ঙ’ ব্যবহৃত হবে। যেমন: রং (কিন্তু রঙিন), সং (কিন্তু সংরা)।
৪. ‘কী’ ও ‘কি’-এর বিভাজন রূপ:
আকাদেমি স্পষ্ট করে দেয় যে, প্রশ্নসূচক হ্যাঁ/না উত্তরভিত্তিক
ক্ষেত্রে ‘কি’ এবং বিস্তারিত উত্তর বা সর্বনামে ‘কী’ বসবে।
উপসংহার:
পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির বানানবিধি প্রবর্তনের ফলে পঠন-পাঠন, সংবাদমাধ্যম ও সাহিত্যচর্চায় একক প্রমিত বানান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বাংলা ভাষার সার্বিক উন্নয়ন ও ডিজিটাল ব্যবহারের ক্ষেত্রকেও সহজতর করেছে।
১৫। কোন্ উপভাষাকে আদর্শ কথ্য-বাংলার ভিত্তি বলে মনে করা হয়? এই
ভাষার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।
উত্তর: আদর্শ কথ্য-বাংলার ভিত্তি:
‘রাঢ়ী’ উপভাষাকে (বিশেষ করে ভাগীরথী নদীর উভয় তীরের কলকাতা, হুগলী,
বর্ধমান, নদিয়া অঞ্চলের কথ্য ভাষাকে) আদর্শ কথ্য-বাংলা বা ‘প্রমিত বাংলা’
(Standard Colloquial Bengali)-এর ভিত্তি বলে মনে করা হয়।
রাঢ়ী উপভাষার ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:
ক) ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য:
১. স্বরসংগতি (Vowel Harmony):
রাঢ়ী উপভাষায় পূর্ববর্তী স্বরধ্বনির প্রভাবে পরবর্তী স্বরধ্বনি অথবা পরবর্তী
স্বরধ্বনির প্রভাবে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনি পরিবর্তিত হয়।
উদাহরণ: বিলাতি → বিলেতি,
দেশি → দিশি।
২. অভিশ্রুতি (Umlaut): অপিনিহিতির ফলে
সরে আসা ‘ই’ বা ‘উ’ কার পার্শ্ববর্তী স্বরধ্বনিকে প্রভাবিত করে নিজে বিলুপ্ত হয়
এবং স্বরধ্বনির পরিবর্তন ঘটায়।
উদাহরণ: করিয়া → (কইরিয়া) → করে; রাখিয়া → (রাইখিয়া) → রেখে।
৩. অ-কারের ও-কারত্ব: রাঢ়ীর উচ্চারণে
শব্দের আদিতে থাকা ‘অ’-ধ্বনি অনেক সময় ‘ও’-ধ্বনিতে পরিণত হয়।
উদাহরণ: অতি → ওতি, মন → মোন।
৪. অনুনাসিকতা: রাঢ়ী উপভাষায়
চন্দ্রবিন্দু (ঁ)-র প্রভাবে অনুনাসিক উচ্চারণের ব্যাপক প্রবণতা দেখা যায় (যেমন:
চাঁদ, বাঁশ, কাঁদা)।
খ) রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য:
১. কারক-বিভক্তি: কর্তাকারকে
শূন্য বা ‘এ’ (বা ‘য়ে’) বিভক্তি এবং কর্মকারকে ‘কে’ বিভক্তি যুক্ত হয় (যেমন: ছেলেকে ডাকো)।
২. ক্রিয়াপদের রূপ:
অতীতকালে সমাপিকা ক্রিয়ায় ‘-ল’ বা ‘-লাম’ (যেমন: খেলাম, গেল)।
ভবিষ্যৎকালে সমাপিকা ক্রিয়ায় ‘-ব’ বা ‘-বে’ (যেমন: যাব, খাবে)।
অসমাপিকা ক্রিয়ায় ‘-তে’, ‘-লে’, ‘-এ’ ব্যবহার দেখা
যায় (যেমন: করতে, খেলে, করে)।
৩. অনুসর্গের ব্যবহার: ‘থেকে’, ‘চেয়ে’, ‘দিয়ে’,
‘জন্য’ প্রভূতি উন্নত অনুসর্গের সুনির্দিষ্ট ব্যবহার।
১৬। অনুবাদের সুবিধা-অসুবিধাগুলি আলোচনা করো।
উত্তর:
অনুবাদ (Translation) হলো এক ভাষাকৈেন্দ্রিক
জ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে অন্য ভাষায় রূপান্তর করার শিল্প। বিশ্বায়নের যুগে
জ্ঞানের আদান-প্রদানে অনুবাদের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনই অনুবাদের ক্ষেত্রে
কিছু জটিলতা ও সীমাবদ্ধতাও বিদ্যমান।
অনুবাদের সুবিধাসমূহ (Advantages):
১. জ্ঞান ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান:
অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার শ্রেষ্ঠ
জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, প্রযুক্তি ও সাহিত্য অন্য ভাষাভাষী মানুষের কাছে পৌঁছায়।
রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদ না হলে তা নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে
বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেত না।
২. আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক
প্রবৃদ্ধি:
ব্যবসা-বাণিজ্য, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক
সম্পর্ক রক্ষায় অনুবাদ সেতু হিসেবে কাজ করে। বহুভাষিক নথি ও চুক্তির অনুবাদ
বিশ্বায়নের মূল চালিকাশক্তি।
৩. নিজ ভাষার সমৃদ্ধি:
অনুবাদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল ভাষার নতুন নতুন
পরিভাষা ও প্রকাশভঙ্গি লক্ষ্য ভাষায় প্রবেশ করে, যার ফলে লক্ষ্য ভাষার শব্দভাণ্ডার
ও প্রকাশক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।
৪. জাতীয় ও সামাজিক সংহতি:
ভারতের মতো বহুভাষিক দেশে বিভিন্ন আঞ্চলিক
সাহিত্যের অনুবাদ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ও
ঐক্য তৈরি করে।
অনুবাদের অসুবিধাসমূহ (Disadvantages/Challenges):
১. আবেগ ও কাব্যরস হানি:
সাহিত্যের ক্ষেত্রে মূল ভাষার আবেগ, ছন্দ,
অলংকার ও নান্দনিক রূপ অনুবাদে অবিকল ফুটিয়ে তোলা কঠিন। প্রখ্যাত উক্তি অনুযায়ী— “Translation is like a woman; if it is faithful, it is not
beautiful; if it is beautiful, it is not faithful.”
২. সংস্কৃতিক ও সামাজিক জটিলতা
(Cultural Gaps):
একটি ভাষার বহু শব্দ নির্দিষ্ট সংস্কৃতির সাথে
যুক্ত থাকে যার অন্য ভাষায় হুবহু প্রতিশব্দ থাকে না। যেমন: বাংলার ‘লক্ষ্মীটি’ বা ‘অভিমান’
শব্দগুলির অবিকল ইংরেজি শব্দ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
৩. দ্ব্যর্থকতা ও ভুল অনুবাদের
ঝুঁকি:
সঠিক শব্দ নির্বাচন না করতে পারলে মূল লেখকের
বক্তব্য বিকৃত হতে পারে, যা আইনি, রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষেত্রে মারাত্মক
বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে।
৪. শব্দবন্ধ ও প্রবাদ-প্রবচনের
আড়ষ্টতা:
প্রবাদ বা বিশিষ্টার্থক শব্দগুচ্ছের (Idioms)
আক্ষরিক অনুবাদ করতে গেলে লেখা তার স্বাভাবিকতা হারিয়ে কৃত্রিম ও প্রাঞ্জলতাহীন
হয়ে পড়ে।
উপসংহার:
কিছু চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও,
মানব সভ্যতার বিকাশ, বিশ্বজনীন শিক্ষা এবং বিশ্বসাহিত্যের সংযোগ স্থাপনে অনুবাদের
ভূমিকা অনস্বীকার্য। একজন দক্ষ অনুবাদক তার দূরদর্শিতা দিয়ে এই অসুবিধাগুলি অতিক্রম
করে মূল ভাব অক্ষুণ্ণ রাখেন।
%20%E0%A7%A8%E0%A6%AF%E0%A6%BC%20%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0%20%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%20(MIL)%20BNGMAE2%20%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%20%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B7%E0%A6%BE%20%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B8%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%20%E0%A6%93%20%E0%A6%85%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6%20%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A6%AA%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0%20%20%E0%A6%89%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%B0%20%E0%A7%A8%E0%A7%A6%E0%A7%A8%E0%A7%AC.png)
0 মন্তব্যসমূহ