Header Ads Widget

WELCOME! ** 100% MOBILE FRIENDLY ONLINE EDUCATIONAL BLOG ** বাংলা সাহিত্য চর্চা ** WELCOME! ** 100% MOBILE FRIENDLY ONLINE EDUCATIONAL BLOG ** বাংলা সাহিত্য চর্চা **

ticker

6/recent/ticker-posts

 বিএ (B.A.) ২য় সেমিস্টারের বাংলা মেজর পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের উত্তর (২০২৬)।  

BNGHMJ2: বাঙালির ধর্ম ও সংস্কৃতি এবং বাংলা সাহিত্যের সাধারণ পরিচয়

প্রশ্নপত্রের একটি সম্পূর্ণ, প্রামাণ্য ও আদর্শ উত্তরমালা।

বিএ (B.A.) ২য় সেমিস্টারের বাংলা মেজর পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের উত্তর (২০২৬)
 বিএ (B.A.) ২য় সেমিস্টারের বাংলা মেজর পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের উত্তর (২০২৬)

বিভাগ - ক

(যে-কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর)

১। বাউল কাদের বলা হয়? দু'জন বাউল সাধকের নাম লেখো।

উত্তর:
        বাউল: যারা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, শাস্ত্রীয় বিধিবিধান ও সামাজিক বর্ণপ্রথা না মেনে কেবল দেহসাধনা এবং 'মনের মানুষ'-এর সন্ধানে সুর ও গানের মাধ্যমে সাধনা করেন, তাদের বাউল বলা হয়।
        দু'জন বাউল সাধক: লালন শাহ (বা লালন ফকির) ও  দুদ্দু শাহ (গগন হরকরা)।

২। চর্যাপদের পুঁথি কবে, কোথা থেকে কী নামে প্রকাশিত হয়?

উত্তর:
        প্রকাশের সময় ও স্থান: ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে (১৩২৩ বঙ্গাব্দে) কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয়।প্রকাশিত নাম: মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহা' নামে প্রকাশিত হয়।

৩। প্রাক্-চৈতন্য ও পরচৈতন্যযুগের দু'জন করে বৈষ্ণব পদকর্তার নাম লেখো।

উত্তর:
        প্রাক্-চৈতন্য যুগের বৈষ্ণব পদকর্তা: চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি।
        পরচৈতন্য যুগের বৈষ্ণব পদকর্তা: জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাস।

৪। আরাকান রাজসভার আদি কবি কে? তাঁর কাব্যের নাম কী?

উত্তর:
        আদি কবি: দৌলত কাজী।
        কাব্যের নাম: 'সতী ময়না ও লোর-চন্দ্রানী' (বা 'সতী ময়না')।

৫। উইলিয়াম কেরি রচিত দু'টি গদ্য গ্রন্থের নাম প্রকাশকালসহ লেখো।

উত্তর: 
            ১. কথোপকথন (১৮০১ খ্রিস্টাব্দ) 
            ২. ইতিহাসমালা (১৮১২ খ্রিস্টাব্দ)

৬। রচয়িতার নাম লেখো: মেঘনাদবধ কাব্য, বিদায় আরতি, অগ্নিবীণা, ছাড়পত্র

উত্তর:
        মেঘনাদবধ কাব্য: মাইকেল মধুসূদন দত্ত
        বিদায় আরতি: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত 
        অগ্নিবীণা: কাজী নজরুল ইসলাম
        ছাড়পত্র: সুকান্ত ভট্টাচার্য

৭। দীনবন্ধু মিত্রের দু'টি প্রহসনের নাম প্রকাশকালসহ লেখো।

উত্তর: 
        ১. বিয়ে পাগলা বুড়ো (১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ) 
        ২. সধবার একাদশী (১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ)

৮। রবীন্দ্রনাথের 'চোখের বালি' উপন্যাসটি কত সাল থেকে কত সাল পর্যন্ত কোন্ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়?

উত্তর:
        পত্রিকা: 'বঙ্গদর্শন' (নবপর্যায়) পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
        সময়কাল: ১৩০৮ বঙ্গাব্দের বৈশাখ থেকে ১৩০৯ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাস পর্যন্ত (১৯০১ – ১৯০২ খ্রিস্টাব্দ)।

বিভাগ - খ

(যে-কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর)

৯। টীকা লেখো: নাথ ধর্ম ও দর্শন

উত্তর:
        নাথধর্ম হলো শৈবধর্ম, বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ধারা এবং প্রাচীন ভারতীয় যোগসাধনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক বিশেষ ধর্মীয় ধারা। এই ধর্মের মূল বক্তব্য হলো দেহতত্ত্ব ও যোগসাধনার মাধ্যমে অমরত্ব লাভ।
        মূল দর্শন: নাথদর্শনের প্রধান লক্ষ্য হলো 'কায়াসাধনা' বা শরীরের রাজযোগ সাধনা। এই মতে, মানবদেহের মধ্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বিদ্যমান। বিন্দু ধারণ ও শ্বাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কুলকুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত করে পরম শিবত্ব লাভ করাই নাথ সাধনার মূল উদ্দেশ্য।
        সাহিত্যিক অবদান: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে নাথ ধর্মকে কেন্দ্র করে 'নাথ সাহিত্য' গড়ে ওঠে। এর দুটি ধারা—একটি গোরক্ষনাথের কাহিনী (যেমন: 'গোরক্ষবিজয়' বা 'মিনচেতন') এবং অপরটি ময়নামতী-গোপীচন্দ্রের কাহিনী (যেমন: 'গোবিন্দচন্দ্র গীত')।

১০। টীকা লেখো: 'সদুক্তিকর্ণামৃত'

উত্তর:
'সদুক্তিকর্ণামৃত' হলো সেনযুগে রচিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃত মুক্তক কাব্য-সংকলন।
        সংকলক ও সময়কাল: লক্ষণসেনের রাজসভার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা শ্রীধরদাস ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে (১২০৬ শকাব্দে) এটি সংকলন করেন।
        বিষয়বস্তু ও বৈশিষ্ট্য: এতে প্রায় ৪৮৫ জন কবির রচিত মোট ২,৩৭০টি সংস্কৃত শ্লোক স্থান পেয়েছে। শ্লোকগুলি ৪৭৭টি 'প্রবাহ' বা শ্রেণীতে বিভক্ত।
        গুরুত্ব: তৎকালীন বাংলার সমাজজীবন, পল্লীপ্রকৃতি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার রূপ এই সংকলনের শ্লোকগুলিতে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। সেনযুগের বঙ্গীয় সংস্কৃতির ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম নির্ভরযোগ্য আকর গ্রন্থ।

১১। চৈতন্যজীবনী সাহিত্যের ধারায় 'চৈতন্যচরিতামৃত' গ্রন্থের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ পর্যালোচনা করো।

উত্তর:
        বাংলা সাহিত্য ও বৈষ্ণব সমাজে কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী রচিত 'চৈতন্যচরিতামৃত' কেবল একটি জীবনীগ্রন্থ নয়, এটি বৈষ্ণব দর্শনের সর্বশ্রেষ্ঠ আকর গ্রন্থ। এর শ্রেষ্ঠত্বের কারণগুলি হলো:

        ১. দার্শনিক ও তত্ত্বগম্ভীর বিশ্লেষণ: বৃন্দাবনের রূপ-সনাতন ও জীব গোস্বামীর বৈষ্ণব দর্শনকে সহজ-সরল বাংলায় অনুবাদ করে চৈতন্যদেবের জীবনপ্রবাহের সাথে যুক্ত করার মুন্সিয়ানা কেবল এই গ্রন্থেই দেখা যায়।
        ২. ঐতিহাসিক প্রামাণিকতা: কবি প্রত্যক্ষদর্শীদের (যেমন: স্বরূপ দামোদর, রঘুনাথদাস গোস্বামী) তথ্য ও স্মৃতিকথা বিশ্লেষণ করে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবনীটি রচনা করেন।
        ৩. ত্রিভঙ্গ জীবনবিভাগ: সমগ্র গ্রন্থটিকে 'আদিখণ্ড', 'মধ্যখণ্ড' ও 'অন্ত্যখণ্ড'—এই তিন পর্বে সুবিন্যস্ত করে চৈতন্য জীবনের তত্ত্বালোক ও রসভাবকে উপস্থাপিত করা হয়েছে।
        ৪. পাণ্ডিত্য ও কবিত্বের মিলন: এতে কাব্যিক রস, ভাষাগত প্রাঞ্জলতা এবং দার্শনিক আলোচনার অনুপম মিশ্রণ ঘটেছে, যা চৈতন্যোত্তর জীবনী সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

১২। পৌরাণিক নাট্যধারায় গিরিশচন্দ্র ঘোষ-এর অবদান আলোচনা করো।

উত্তর:
উনিশ শতকের শেষভাগে বাংলা নাট্যমঞ্চকে সাধারণ মানুষের জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দিতে নাট্যচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষের পৌরাণিক নাটকগুলির অবদান ছিল অপরিসীম।
        ভক্তি ও পৌরাণিক ভাবাবেগ: রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণ থেকে কাহিনী নিয়ে তিনি নব্য-শিক্ষিত বাঙালি সমাজে ভক্তিরস ও ধর্মানুভূতিকে জাগ্রত করেন।
        উল্লেখযোগ্য নাটক: তাঁর রচিত 'রাবণবধ' (১৮৮১), 'অভিমন্যুবধ', 'সীতার বনবাস', 'পাণ্ডব গৌরব', 'জনা' (১৮৯৪) এবং 'বিল্বমঙ্গল' পৌরাণিক নাট্যধারার অমূল্য রত্ন।
        নাটকীয় উৎকর্ষ ও গৈরীশ ছন্দ: চরিত্র সৃষ্টিতে তিনি মানবমনস্তত্ত্ব ও পৌরাণিক বিশ্বাসের মেলবন্ধন ঘটান। এ ছাড়া পৌরাণিক নাটকের উপযোগী সংলাপ পরিবেশনে তিনি 'গৈরীশ ছন্দ' প্রবর্তন করেন, যা নাটকের নাট্যগুণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

১৩। বাংলা ছোটগল্পের ধারায় রাজশেখর বসু (পরশুরাম)-এর কৃতিত্ব লেখো।

উত্তর:
বাংলা ছোটগল্পের ধারায় রাজশেখর বসু (ছদ্মনাম: পরশুরাম) ব্যঙ্গ, কৌতুক ও হাস্যরসের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
        ব্যঙ্গ ও কৌতুকরসের নতুন শৈলী: তাঁর গল্পে কৌতুক কেবল হাস্যরস সৃষ্টির জন্য নয়, বরং সমাজব্যবস্থা, ভণ্ডামি, অন্ধবিশ্বাস ও তৎকালীন আধুনিক সভ্যতার অসংগতিকে তীব্র ব্যঙ্গ (Satire) করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
        উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ: 'গড্ডলিকা' (১৯২৪), 'কজ্জলী' (১৯২৭), 'হনুমানের স্বপ্ন', 'ধূস্তুরী মায়া' প্রভৃতি তাঁর স্মরণীয় গল্প সংকলন।
        চরিত্র চিত্রণ ও ভাষা: 'ভূষণ্ডীর মাঠ', 'শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড', 'লম্বকর্ণ'-এর মতো গল্পে তিনি যে অসামান্য চরিত্র সৃষ্টি করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি, মেদহীন গদ্যভাষা ও বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে ছোটগল্পে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে।

১৪। আধুনিক বাংলা কাব্যধারায় জীবনানন্দ দাশের স্বাতন্ত্র্য বিচার করো।

উত্তর:
        রবীন্দ্র-উত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার ধারায় জীবনানন্দ দাশ হলেন সবচেয়ে স্বতন্ত্র এবং প্রভাবশালী কবি। তাঁর কাব্যের প্রধান স্বাতন্ত্র্যগুলি হলো:

        ১. রূপসী বাংলা ও নিসর্গ চেতনা: প্রকৃতির সাথে মানুষের আত্মিক সম্পর্ককে তিনি অসাধারণ চিত্রময়তায় ফুটিয়ে তুলেছেন। ঘাস, শিশির, ধানসিঁড়ি নদী, পেঁচা, শালিক তাঁর কবিতায় নতুন ব্যঞ্জনা পায়।
        ২. চিত্রকল্প ও অনুভূতি (Synesthesia): জীবনানন্দের কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর অতুলনীয় চিত্রকল্পময়তা। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপক ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি দৃশ্য, শব্দ ও গন্ধকে একীভূত করেছেন (যেমন: "রোদের নরম রঙ শিশুর গালের মত লাল")।
        ৩. ইতিহাস ও কালচেতনা: কেবল তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতা নয়, বরং সুদূর অতীতের ইতিহাস, মানব সভ্যতার আদিমতা ও অনাগত ভবিষ্যৎকে তিনি একই ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন (যেমন: 'বনলতা সেন')।
        ৪. বিষাদ ও নির্জনতার সুর: তাঁর কবিতায় গভীর নির্জনতা, জীবনের ক্লান্তি, হতাশা এবং মৃত্যুর প্রচ্ছন্ন ছায়া পরিব্যাপ্ত, যা তাঁকে 'নির্জনতম কবি'র খ্যাতি দিয়েছে।

বিভাগ - গ

(যে-কোনো তিনটি প্রশ্নের উত্তর)

১৫। সংক্ষেপে বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয় দাও।

উত্তর:
ভূমিকা:
'সংস্কৃতি' হলো কোনো জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, চিন্তা-ভাবনা, আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মবিশ্বাস, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সামগ্রিক প্রতিফলন। ভৌগোলিক পরিবেশ এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির এক স্বাতন্ত্র্যসূচক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

বাঙালি সংস্কৃতির মূল স্তম্ভসমূহ:

১. কৃষি ও নদীভিত্তিক ভৌগোলিক গঠন:
পলিগঠিত বাংলা নদীমাতৃক দেশ। ফলে কৃষি (ধান, পাট) এবং নদী (মাছ, নৌকা) কেন্দ্রিক জীবনধারা বাঙালি সংস্কৃতির প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। "মাছে-ভাতে বাঙালি" উক্তিটি এই সংস্কৃতির সামাজিক ভিত্তিপ্রস্তর।

২. ধর্মীয় সহনশীলতা ও সমন্বয়বাদ:
বাঙালি সংস্কৃতিতে আর্য ও অনার্য উপাদানের গভীর মিশ্রণ রয়েছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, ইসলাম ও লোকধর্মের মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে এক সমন্বয়ী সংস্কৃতি। বাউল, সুফি সাধনা, নাথ ধর্ম এবং চৈতন্যদেবের 'প্রেমধর্ম' বাঙালি মননকে অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী করেছে।

৩. লোকসংস্কৃতি ও উৎসব:
'বারো মাসে তেরো পার্বণ'-এর দেশ বাংলা। দুর্গোৎসব, ঈদ, নবান্ন, পহেলা বৈশাখ, পৌষ সংক্রান্তি, গাজন এবং বৈশাখী মেলা বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণশক্তি। এ ছাড়া ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, গম্ভীরা, জারি-সারি গান এবং পটচিত্র, কাঁথা সেলাই ও পোড়ামাটির শিল্প লোকসংস্কৃতির সমৃদ্ধির পরিচয় দেয়।

৪. ভাষা ও সাহিত্য:
বাংলা ভাষাই বাঙালি সংস্কৃতির মূল পরিচয়পত্র। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য এবং আধুনিক যুগে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের সাহিত্যের মধ্য দিয়ে বাঙালি মনন বৈশ্বিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সংস্কৃতির সাথে ভাষার নাড়ির টানকে প্রমাণ করে।
উপসংহার:
পরমতসহিষ্ণুতা, আবেগ, অতিথি পরায়ণতা এবং নান্দনিকতা হলো বাঙালি সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি। বিশ্বায়নের যুগে দাঁড়িয়েও বাঙালি তার মূল সাংস্কৃতিক শিকড়কে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে।

১৬। 'নূতন মঙ্গল' হিসেবে ভারতচন্দ্রের 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যের গুরুত্ব পর্যালোচনা করো।

উত্তর:
ভূমিকা:
অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে নদিয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর রচিত 'অন্নদামঙ্গল' কাব্য মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য ধারার শেষ প্রদীপ এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সূচনাপর্বের সেতুস্বরূপ। কবি স্বয়ং এই কাব্যকে 'নূতন মঙ্গল' বলে চিহ্নিত করেছেন।
'নূতন মঙ্গল' হিসেবে অন্নদামঙ্গলের গুরুত্ব ও স্বাতন্ত্র্য:
১. দেবমহিমা হ্রাসের বিপরীতে মানবায়ন:
ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলকাব্যে দেবতাদের ক্রূরতা ও অলৌকিক মহিমা প্রাধান্য পেত। কিন্তু ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে পৌরাণিক দেবী অন্নপূর্ণা লৌকিক গৃহবধূ বা সাধারণ মানবী রূপে আত্মপ্রকাশ করেছেন। ঈশ্বরী পাটনীর মুখে "আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে" প্রার্থনার মধ্যে দেবীর অলৌকিকত্বের চেয়ে মানবকল্যাণকামী বাস্তব মনস্তত্ত্বই বড় হয়ে উঠেছে।
২. রাজসভাভিত্তিক নাগরিক রুচি:
ভারতচন্দ্রের কাব্য দেবালয়ে নয়, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় বসে রচিত। তাই এতে পল্লীবাংলার লৌকিক সরলতার চেয়ে নাগরিক মার্জিত রুচি, রাজসভার বিলাসিতা, ব্যঙ্গপ্রবণতা ও শৃঙ্গাররসের প্রাধান্য দেখা যায়।
৩. সংস্কৃত ও ফারসি শব্দের অভূতপূর্ব মিশ্রণ:
ভারতচন্দ্র প্রথম দেখালেন কীভাবে সংস্কৃত সাহিত্য ও ফারসি শব্দের সাথে বাংলা ভাষার সমন্বয় ঘটিয়ে মার্জিত ও অলংকারসমৃদ্ধ পদাবলী রচনা করা যায়। তাঁর রচিত "মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন" বা "আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে" সুবচন হিসেবে সমাজে প্রচলিত হয়।
৪. ছন্দ ও অলংকার প্রয়োগে অসামান্য দক্ষতা:
ভারতচন্দ্রকে 'ছন্দের জাদুকর' বলা হয়। অন্নদামঙ্গলে তাঁর ব্যবহৃত অন্নদা-অন্নপূর্ণা বন্দনা, চোরাষ্টক ছন্দ এবং অসামান্য শব্দালংকার ব্যবহারের ফলে মধ্যযুগীয় পয়ার ছন্দের জড়তা কেটে এক ঝরঝরে প্রমিত রূপ তৈরি হয়।
উপসংহার:
'অন্নদামঙ্গল' কাব্যে মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের কাঠামো থাকলেও তার ভেতরের আত্মাটি ছিল আধুনিক ও বাস্তবমুখী। এই কারণেই ড. সুকুমার সেন ভারতচন্দ্রকে "মধ্যযুগের শেষ কবি এবং আধুনিক যুগের প্রথম কবি" হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

১৭। বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান আলোচনা করো।

উত্তর:
ভূমিকা:
উনিশ শতকের রেনেসাঁর অন্যতম পথপ্রদর্শক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে প্রাথমিক আড়ষ্টতা ও অসামঞ্জস্য থেকে মুক্ত করে এক মার্জিত, সুশৃঙ্খল ও গতিশীল রূপ দান করেন। তাই তাঁকে 'বাংলা গদ্যের জনক' বলা হয়।

গদ্যের বিকাশে বিদ্যাসাগরের মূল অবদানসমূহ:

১. জতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্নের প্রবর্তন:
বিদ্যাসাগরের পূর্বে বাংলা গদ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট যতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্নের (Comma, Semicolon, Full stop) নিয়মসিদ্ধ ব্যবহার ছিল না। বিদ্যাসাগরই প্রথম ইংরেজি বাক্যের গঠনরীতি পর্যবেক্ষণ করে বাংলায় যথাযথ বিরামচিহ্ন প্রয়োগ করেন, যার ফলে বাংলা গদ্য পঠনযোগ্য ও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

২. গদ্যে শব্দসঙ্গীত ও স্বরসংগতির রূপায়ণ:
বিদ্যাসাগর তৎসম, তদ্ভব ও প্রমিত শব্দের সুষম বিন্যাস ঘটিয়ে বাংলা গদ্যে এক চমৎকার লয় ও শব্দসঙ্গীত প্রবর্তন করেন। তাঁর গদ্য পড়লে এক ধরণের প্রাঞ্জল কাব্যিক অনুভূতি সৃষ্টি হয়।

৩. শিক্ষামূলক ও শিশুসাহিত্য গদ্য:
শিশুশিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার জন্য তিনি 'বর্ণপরিচয়' (১ম ও ২য় ভাগ), 'বোধোদয়', 'কথামালা', 'আখ্যানমঞ্জরী' প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। বর্ণপরিচয়ে বর্ণমালার বিন্যাস ও গদ্যের প্রথম সহজ পাঠ বাংলা শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপ্লব আনে।

৪. অনুবাদ ও মৌলিক গদ্য রচনার ধারা:
তিনি সংস্কৃত ও ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত কাহিনীগুলিকে বাংলায় রূপান্তর করে সাহিত্যিক গদ্যের ভিত্তি মজবুত করেন।
অনুবাদ সাহিত্য: 'বেতাল পঞ্চবিংশতি' (১৮৪৭), 'শকুন্তলা' (১৮৫৪), 'সীতার বনবাস' (১৮৬০), 'ভ্রান্তিবিলাস' (১৮৬৯)।
সমাজ সংস্কারমূলক গদ্য: 'বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব' এবং তীব্র ব্যঙ্গাত্মক 'অতি অল্প হইল', 'আবার অতি অল্প হইল' ইত্যাদি।
উপসংহার:
রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের গদ্যরীতির প্রশংসা করে লিখেছিলেন যে, বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যভাষার শিল্প রূপায়িত করিয়াছিলেন... তিনি বাংলা গদ্যকে প্রথম সুবিন্যস্ত ও গতিশীল করেন। সুতরাং, আধুনিক বাংলা সাহিত্য যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, বিদ্যাসাগরই তার মূল স্থপতি।

১৮। বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে শরৎচন্দ্রের কৃতিত্ব পর্যালোচনা করো।

উত্তর:
ভূমিকা:
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আদর্শ ও রবীন্দ্রনাথের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা উপন্যাসে এক বিশাল সাধারণ পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেন। তিনি বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের অন্তরমহল ও গ্রামীণ জীবনকে উপন্যাসের মূল উপজীব্য করে তোলেন।

শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের প্রধান কৃতিত্বসমূহ:

১. বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবার ও গ্রামীণ সামাজিক বাস্তব রূপায়ণ:
শরৎচন্দ্রই প্রথম উপন্যাসকে রাজপ্রাসাদ বা ঐতিহাসিক পটভূমি থেকে বের করে এনে পল্লীবাংলার জীর্ণ কুটির ও মধ্যবিত্ত ঘরের রান্নাঘরে স্থাপন করেন। 'পল্লীসমাজ', 'বিন্দুর ছেলে', 'মেজোদিদি', 'রামের সুমতি' উপন্যাসে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা, অন্ধসংস্কার ও পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন অত্যন্ত আবেগঘনভাবে ফুটে উঠেছে।

২. নারীমনস্তত্ত্ব ও অবহেলিত নারীর প্রতি সহানুভূতি:
শরৎ-সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নারী চরিত্র চিত্রণ। সমাজ পরিত্যক্তা, কুলটা বা অবহেলিত নারী চরিত্রকে তিনি গভীর সহানুভূতির সাথে এঁকেছেন। 'দেবদাস'-এর পারো ও চন্দ্রমুখী, 'চরিত্রহীন'-এর কিরণময়ী ও সাবিত্রী, 'গৃহদাহ'-এর অচলা এবং 'শ্রীকান্ত'-এর রাজলক্ষ্মী ও অভয়া চরিত্রগুলি তাঁর অমলিন সৃষ্টি।

৩. সমাজ সংস্কার ও প্রতিবাদী চেতনা:
শরৎচন্দ্র কেবল ভাবালুতার গল্প লেখেননি; হিন্দু সমাজের জাতপাত, অস্পৃশ্যতা, কুসংস্কার ও পুরুষতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। 'ব্রাহ্মণের দেনা', 'আরাক্ষণীয়' এবং রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডে রচিত নিষিদ্ধ উপন্যাস 'পথের দাবী'-তে তাঁর এই মুক্তিকামী চেতনা প্রকাশ পেয়েছে।

৪. আত্মজৈবনিক ও ভ্রমণধর্মী উপন্যাস:
তাঁর চার খণ্ডে রচিত মহাকাব্যিক উপন্যাস 'শ্রীকান্ত' বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। শ্রীকান্ত চরিত্রের মাধ্যমে তিনি পরিব্রাজক মন এবং জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে সহজ-সরল আত্মজৈবনিক ভঙ্গিতে পরিবেশন করেছেন।

উপসংহার:
সহজ-সরল ভাষা, অগভীর অথচ মানবিক আবেগ এবং পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছানোর অসামান্য ক্ষমতার জন্য শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে 'অপরাজেয় কথাশিল্পী' বলা হয়। বাংলা উপন্যাসের জনপ্রিয়তার ইতিহাসে তাঁর অবস্থান চিরস্থায়ী।

১৯। রবীন্দ্র কাব্য ভাবনার নাতিদীর্ঘ পরিচয় দাও।

উত্তর:
ভূমিকা:
প্রায় দীর্ঘ সাত দশকের কাব্যসাধনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা কবিতাকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর কাব্যভাবনা স্থির কোনো বিন্দুতে থমকে থাকেনি, বরং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অবিরাম গতিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

রবীন্দ্র কাব্য ভাবনার বিভিন্ন পর্যায় ও বৈশিষ্ট্য:

১. উন্মেষ ও উন্মাদনার পর্ব (সূচনা থেকে সোনার তরী):
'কবিকাহিনী', 'সন্ধ্যাসংগীত', 'প্রভাতসংগীত' দিয়ে তাঁর কাব্যযাত্রার সূচনা। 'প্রভাতসংগীত'-এর 'নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ' কবিতায় কবির বিশ্বসত্তার সাথে মেলবন্ধনের প্রথম সংকেত মেলে। 'সোনার তরী' ও 'চিত্রা' পর্বে কবিসৌন্দর্যবোধ ও 'জীবনদেবতা'র তত্ত্ব লাভ করে পূর্ণতা।

২. আধ্যাত্মিকতা ও ভক্তিভাবনার পর্ব (খেয়া ও গীতাঞ্জলি পর্ব):
'খেয়া', 'গীতাঞ্জলি', 'গীতিমাল্য', 'গীতালী' কাব্যে কবির কাব্যভাবনা ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ ও ভক্তিসাধনায় নিমজ্জিত হয়। ঈশ্বর এখানে কোনো দূরের সত্তা নন, তিনি যেন কবির পরম সখা বা প্রিয়তম। এই পর্বের সৃষ্টির জন্যই তিনি ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

৩. গতিশীলতা ও কালচেতনার পর্ব (বলাকা পর্ব):
'বলাকা' (১৯১৬) কাব্যে কবির ভাবনায় নতুন যুগের হাওয়া লাগে। এখানে তিনি গতির রূপকার। যৌবনের জয়গান, বিশ্বযুদ্ধের করুণ বাস্তবতা এবং 'গতিই জীবন, স্থবিরতাই মৃত্যু'—এই জীবনদর্শন প্রকাশিত হয়।

৪. বাস্তবমুখী ও গদ্যকবিতার পর্ব (শেষ পর্যায়):
জীবনের শেষ পর্বে ('পুনশ্চ', 'শেষ সপ্তক', 'পত্রপুট', 'শ্যামলী') কবি প্রথাগত ছন্দ ভেঙে গদ্যকবিতার রূপায়ণ ঘটান। এখানে সাধারণ মাটি, ধুলোবালি, মেথর বা রিকশাওয়ালার মতো সাধারণ মানুষ ও তুচ্ছ বস্তু তাঁর কাব্যভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। 'রোগশয্যায়', 'আরোগ্যো' কাব্যে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি জীবনের জয়গান গেয়েছেন।

উপসংহার:
রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাবনার মূল সুর হলো—সৌন্দর্যবোধ, মানবতাবাদ, প্রকৃতির সাথে আত্মার একাত্মতা এবং সীমাবদ্ধ সীমার মাঝে অসীমকে পাওয়ার নিরন্তর আকুলতা ("সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর")।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ