Header Ads Widget

WELCOME! ** 100% MOBILE FRIENDLY ONLINE EDUCATIONAL BLOG ** বাংলা সাহিত্য চর্চা ** WELCOME! ** 100% MOBILE FRIENDLY ONLINE EDUCATIONAL BLOG ** বাংলা সাহিত্য চর্চা **

ticker

6/recent/ticker-posts

ছিন্নপত্র-৩০ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 ছিন্নপত্র-৩০ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছিন্নপত্র - ৩০

ছিন্নপত্র ৩০
সাজাদপুর, 
৪ঠা জুলাই, ১৮৯১।

    আমাদের ঘাটে একটি নৌকো লেগে আছে, এবং এখানকার অনেকগুলি “জনপদবধূ” তার সম্মুখে ভিড় করে দাঁড়িয়েচে। বোধ হয় একজন কে কোথায় যাচ্চে এবং তাকে বিদায় দিতে সবাই এসেচে। অনেকগুলি কচিছেলে অনেকগুলি ঘোমটা এবং অনেকগুলি পাকা চুল একত্র হয়েচে। কিন্তু ওদের মধ্যে একটি মেয়ে আছে তার প্রতিই আমার মনোযোগটা সর্ব্বাপেক্ষা আকৃষ্ট হচ্চে। বোধ হয় বয়সে বারো-তেরো হবে, কিন্তু একটু হৃষ্ট পুষ্ট হওয়াতে চোদ্দ পনেরো দেখাচ্চে। মুখখানি বেড়ে। বেশ কালো অথচ বেশ দেখতে। ছেলেদের মত চুল ছাঁটা, তাতে মুখটি বেশ দেখাচ্চে। এমন বুদ্ধিমান এবং সপ্রতিভ এবং পরিষ্কার সরলভাব। একটা ছেলে কোলে করে এমন নিঃসঙ্কোচ কৌতূহলের সঙ্গে আমাকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল! তার মুখখানিতে কিছু যেন নির্ব্বুদ্ধিতা কিম্বা অসরলতা কিম্বা অসম্পূর্ণতা নেই। বিশেষতঃ আধা ছেলে আধা মেয়ের মত হয়ে আরো একটু বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে। ছেলেদের মত আত্মসম্বন্ধে সম্পূর্ণ অচেতন ভাব এবং তার সঙ্গে মাধুরী মিশে ভারি নতুন রকমের একটি মেয়ে তৈরি হয়েছে। বাংলা দেশে যে এরকম ছাঁদের “জনপদবধূ” দেখা যাবে এমন প্রত্যাশা করিনি। দেখচি এদের বংশটাই তেমন বেশী লাজুক নয়। একজন মেয়ে ডাঙায় দাঁড়িয়ে রৌদ্রে চুল এলিয়ে দশাঙ্গুলি দ্বারা জটা ছাড়াচ্চে এবং নৌকোর আর একটি রমণীর সঙ্গে উচ্চৈঃস্বরে ঘরকরনার আলাপ হচ্চে। শোনা গেল তার একটি মাত্র “ম্যায়া” অন্য “ছাওয়াল নাই”—কিন্তু সে মেয়েটির বুদ্ধিসুদ্ধি নেই— “কারে কি কয় কারে কি হয়—আপন পর জ্ঞান নেই”—আরো অবগত হওয়া গেল গোপাল সার জামাইটি তেমন ভাল হয়নি, মেয়ে তার কাছে যেতে চায় না। অবশেষে যখন যাত্রার সময় হল তখন দেখলুম আমার সেই চুলছাঁটা, গোলগাল হাতে-বালা-পরা, উজ্জ্বল সরল মুখশ্রী মেয়েটিকে নৌকোয় তুললে। বুঝলুম, বেচারা বোধ হয় বাপের বাড়ি থেকে স্বামীর ঘরে যাচ্চে। নৌকো যখন ছেড়ে দিলে মেয়েরা ডাঙায় দাঁড়িয়ে চেয়ে রইল, দুই একজন আঁচল দিয়ে ধীরে ধীরে নাকচোখ মুছতে লাগ্‌ল। একটি ছোট মেয়ে, খুব এঁটে চুল বাঁধা, একটি বর্ষীয়সীর কোলে চড়ে তার গলা জড়িয়ে তার কাঁধের উপর মাথাটি রেখে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। যে গেল সে বোধ হয় এ বেচারির দিদিমণি, এর পুতুলখেলায় বোধ হয় মাঝেমাঝে যোগ দিত, বোধ হয় দুষ্টমি করলে মাঝেমাঝে সে একে ঢিপিয়ে দিত। সকালবেলাকার রৌদ্র এবং নদীতীর এবং সমস্ত এমন গভীর বিষাদে পূর্ণ বোধ হতে লাগল! সকালবেলাকার একটা অত্যন্ত হতাশ্বাস করুণ রাগিণীর মত। মনে হল সমস্ত পৃথিবীটা এমন সুন্দর অথচ এমন বেদনায় পরিপূর্ণ! এই অজ্ঞাত ছোট মেয়েটির ইতিহাস আমার যেন অনেকটা পরিচিত হয়েগেল। বিদায়কালে এই নৌকো করে নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়ার মধ্যে যেন আরো একটু বেশি করুণা আছে। অনেকটা যেন মৃত্যুর মত—তীর থেকে প্রবাহে ভেসে যাওয়া—যারা দাঁড়িয়ে থাকে তারা আবার চোখ মুছে ফিরে যায়, যে ভেসে গেল সে অদৃশ্য হয়ে গেল। জানি, এই গভীর বেদনাটুকু, যারা রইল এবং যে গেল উভয়েই ভুলে যাবে, হয়ত এতক্ষণে অনেকটা লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। বেদনাটুকু ক্ষণিক এবং বিস্মৃতিই চিরস্থায়ী কিন্তু ভেবে দেখতে গেলে এই বেদনাটুকুই বাস্তবিক সত্য—বিস্মৃতি সত্যি নয়। এক-একটা বিচ্ছেদ এবং এক-একটা মৃত্যুর সময় মানুষ সহসা জানতে পারে এই ব্যথাটা কি ভয়ঙ্কর সত্য। জানতে পারে, যে মানুষ কেবল ভ্রমক্রমেই নিশ্চিন্ত থাকে। কেউ থাকে না—এবং সেইটে মনে করলে মানুষ আরো ব্যাকুল হয়েওঠে। কেবল যে থাকবে না তা নয়, কারো মনেও থাকবে না। একেবারে আমাদের দেশের করুণ রাগিণী ছাড়া সমস্ত মানুষের পক্ষে আর কোন গান সম্ভবে না।

তোমার মূল্যায়নের জন্য
ভালোভাবে এই ছিন্নপত্র ৩০ পড়া হয়ে গেলে নিচে স্ক্রল করো।
নিজের নাম, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম লেখো।
এরপর Next অংশে টাচ/ ট্যাপ / ক্লিক করো।
তোমার মূল্যায়নের জন্য প্রশ্নপত্র চলে আসবে।
সমস্ত প্রশ্নের উত্তর চিহ্নিত করার পরে Submit করে দাও।


(বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা স্নাতক সাম্মনিক কোর্স-এর জন্য নির্ধারিত পাঠ্যসূচিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'ছিন্নপত্র' পাঠ্য হিসেবে রয়েছে।) 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ